Advertisement

ধর্ষণের সব মামলায় ডিএনএ প্রমাণ বাধ্যতামূলক: এটি ভিকটিমকে সাহায্য করবে নাকি ক্ষতিগ্রস্ত করবে?




এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ধর্ষণের মামলায়, ডিএনএ প্রমাণ তদন্ত এবং মামলাকে শক্তিশালী করতে পারে। অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পৃক্ততা নির্ধারণ করা অথবা সন্দেহভাজন অভিযুক্তকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা প্রায়ই ধর্ষণের মামলায় নিখুঁত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। 

ধর্ষণ মামলার তদন্তে যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত বা অভিযুক্তের ডিএনএ পাওয়া যায়, তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা সাধারণত নমুনাগুলো সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষাগারে পাঠান। 

ডিওক্সাইরিবোনুক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) আইন ২০১৪ কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, নমুনা ধ্বংস, তথ্যের অপব্যবহারের দায়বদ্ধতা ইত্যাদির আইনী বিধানসমূহের রূপরেখা প্রকাশ করা হয়েছিল। ডিএনএ আইনের অধীনে ডিএনএ রিপোর্টকে আদালতের কার্যক্রমে প্রমাণ হিসাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়েছে।

তবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ইতিমধ্যে বিদ্যমান প্রক্রিয়া সত্ত্বেও, মহিলা ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (ডাব্লুসিআরপিএ) -এ বহুল আলোচিত সংশোধনীতে ডব্লিউসিআরপিএর অধীনে সমস্ত অপরাধে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজনে আরও একটি বিধান (ধারা 32 এ) যুক্ত করা হয়েছিল।

৩২ এ ধারায় বলা হয়েছে যে, ডব্লিউসিআরপিএ এর অধীনে সংঘটিত সকল অপরাধের ক্ষেত্রে, ডিএনএ পরীক্ষা ভুক্তভোগী এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি উভয়ের জন্য এ জাতীয় পরীক্ষায় সম্মতি নির্বিশেষে করানো উচিত। তবে ধর্ষণের সব মামলায় ডিএনএ প্রমাণ আদালত বা তদন্ত কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আসতে পারে না।

উদাহরণস্বরূপ, ধর্ষণের মামলায় সর্বাধিক বিতর্কিত বিষয় হ'লো ভুক্তভোগী ও আসামির যৌন মিলন সম্মতিতে হয়েছিল কি না।

যদিও ডিএনএ প্রমাণ এই প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি এই কাজের সাথে জড়িত ছিল কি না। এটি উভয় পক্ষই স্বীকার করে যে যৌন মিলন হয়েছে। কিন্তু তা সম্মতিতে হয়েছিল কি না তা প্রমাণ করতে পারে না।

নতুন ধারায় আসলে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা কেবল ধর্ষণ মামলায় নয়, ডাব্লুসিআরপিএর বিভিন্ন বিধানের আওতায় সংঘটিত অন্যান্য সমস্ত অপরাধে প্রযোজ্য করে তোলে।

বলা বাহুল্য, ডাব্লুসিআরপিএর অধীনে দায়েরকৃত সকল অপরাধে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন নাও হতে পারে এবং মামলার ভিত্তিতে আলাদা হতে পারে।

সব ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার এমন বাধ্যতামূলক বিধান তদন্ত প্রক্রিয়াটিকে আরও বিলম্বিত করতে পারে এবং ডিএনএ পরীক্ষাগারগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডাব্লুসিআরপিএ-এর আওতায় দায়ের করা ধর্ষণ মামলার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, ভুক্তভোগীর কোনও ডিএনএ নমুনা সরবরাহ করা হয়নি, হয় মামলা দায়ের করতে দেরি হওয়ার কারণে বা নিজেই গোসল, প্রস্রাব, কাপড় ধুয়ে সমস্ত প্রাসঙ্গিক নমুনাগুলি নষ্ট করে দিতে পারেন ইত্যাদি।

এমনও ঘটনা রয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীর যোনি থেকে কোনও ডিএনএ নমুনা পাওয়া যায়নি। কারণ, অপরাধী কোনও কনডম ব্যবহার করতে পারে বা কোনও ডিএনএ ছাড়েনি।

এসব ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সাধারণত অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণের উপর নির্ভর করেন।

যাইহোক, ডাব্লুসিআরপিএতে এই নতুন ধারাটি সমস্ত ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রমাণ সংগ্রহের বিষয়ে সুস্পষ্ট জোর দিয়ে যুক্ত হওয়ার পরে, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের উপর নির্ভরতার প্রবণতা আরও কঠোরভাবে অনুশীলন করা যেতে পারে।

এর অর্থ হল যেসব ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করা যায় না বা আসামির ডিএনএ খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে যে অভিযুক্ত পুরোপুরি অভিযোগ থেকে খালাস পেতে পারে; বা বিচার চলাকালীন, অভিযোগ প্রমাণ করার পক্ষে অন্যান্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মামলাটি যথেষ্ট পরিমাণে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

চিকিৎসার এই প্রমাণগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রবণতা বিদ্যমান ধর্ষণ মামলায় দেখা যাচ্ছে,  যা সাধারণত ভিকটিমের সাক্ষ্যের প্রমাণকে দুর্বল করে।

আরও একটি ঝুঁকি হলো যে, ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে ভুল করতে পারে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ। কারণ, ডিএনএ নমুনাগুলো সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ দূষণমুক্ত পরিবেশে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি দূষিত ডিএনএ রিপোর্ট নিঃসন্দেহে মারাত্মক পরিণতি ঘটায়। কারণ, এটি অভিযোগের দোষী ব্যক্তিকে খালাস করতে পারে বা নির্দোষ ব্যক্তিকে জড়িত করতে পারে।

যদি কোনও বিশেষ কেসের প্রয়োজন হয় বা না হয় তবে ডিএনএ পরীক্ষাগুলি যদি এত বিশাল সংখ্যায় করা হয়, তবে নমুনাগুলি এবং রিপোর্টগুলি ভুলভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই বেশি হবে।

চূড়ান্ত পরিণতি হ'ল ধর্ষণের শিকারের ওপর আরও বোঝা চাপিয়ে দেওয়া।

ডাব্লুসিআরপিএর ধারা ৩২ এ, ডিএনএ নমুনা নেওয়ার আগে ভুক্তভোগী এবং অভিযুক্ত উভয়ের সম্মতি পাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

 তবে ডিএনএ আইনের ক্ষেত্রে এ জাতীয় সম্মতি নেওয়া দরকার, কারণ এটি একটি প্রমিত নিয়ম যে কোনও ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা তার অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের নীতিমালা অনুযায়ী, কারও সম্মতি ব্যতীত তার বৈজ্ঞানিক ও চিকিত্সা সক্রান্ত পরীক্ষা করা যাবে না।

যদি কোনও ব্যক্তি সম্মতি দিতে রাজি না হয়, ডিএনএ আইনে বিধান আছে যে, কর্তৃপক্ষ তখন আদালতের অনুমতি নিতে পারে।

তবে নতুন সংশোধনীতে বিশেষত ভিকটিমের সম্মতি পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাদ দেওয়া বরং একটি সমস্যা।

কোনও আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ডিএনএ নমুনা দেওয়ার জন্য  বাধ্য করার অনুমতি দেওয়া একটি বিপজ্জনক প্রস্তাব, যা পুনর্বিবেচনা করা দরকার।

এ ছাড়া ডাব্লুসিআরপিএতে এ জাতীয় বাধ্যতামূলক বিধান যুক্ত করার আগে ডিএনএ নমুনা  সঠিকভাবে পরীক্ষাগারগুলো সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য পুলিশদের বিস্তৃত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা দরকার ছিল। পাশাপাশি ধর্ষণ মামলায় ডিএনএ প্রমাণের স্বীকৃতির মান সম্পর্কে আইনজীবী ও বিচারকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।

একই সাথে, ডিএনএ পরীক্ষাগারগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিপুল সংখ্যক সম্ভাব্য ডিএনএ নমুনার পুরোপুরি মূল্যায়ন করার জন্য তাদের সক্ষমতা পরীক্ষা করা দরকার। 

এইভাবে ডাব্লুসিআরপিএতে এই বিধানের অন্তর্ভুক্তি তথা ধর্ষণ আইন সংস্কার ভুক্তভোগীর উপকারের জন্য, তার অগ্নিপরীক্ষা বাড়াতে নয়, তা মনে রেখে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।

 লেখক: তাসলিমা ইয়াসমিন, আইন গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের শিক্ষক।

 Email: taslima47@yahoo.com.

সূত্র: ডেইলি স্টার,  ২৭ অক্টোবর ২০২০।

বি.দ্র: অনুবাদে ভুল ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন এবং ভুলের সংশোধনী জানাবেন কমেন্টে।



 

Post a Comment

0 Comments